সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২১

লক্ষ্মীপুর নিউজ

দিন বদলের প্রত্যয়ে

আওয়ামী রাজনীতির প্রাণপুরুষ ঢাকা কলেজের সেই জসিম

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: ১৯৮২ সাল। ওই বছরের ২৪ মার্চ দেশের ক্ষমতায় জোর করে চেপে বসেছিলেন এক স্বৈরাচার। নাম হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ছিলেন সেনা প্রধান। রাষ্ট্রপতি হয়েই হরণ করেছিলেন, মানুষের মৌলিক অধিকার। নিষিদ্ধ করেছিলেন রাজনীতি। তার শাসনের প্রথমদিকে, দুর্বিষহ এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, পুরো জাতিকে। সেই কঠিন সময়ে বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার দিন, তথা ১৫ আগষ্ট কোনো ধরণের কর্মসূচি পালন করার মতো বুকের পাঠা কোনো রাজনীতিবিদেরও ছিল না।

সরকারি প্রতিষ্ঠান তো দূর, বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেও ১৫ই আগস্টে যে কোনো কর্মসূচি পালন ছিল নিষিদ্ধ। প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই তখন ১৫ আগষ্টে কালো পতাকা উড়ানোর দুঃসাহস ছিল না কারো।
এরশাদ সরকারের আমলে গনতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন-সংগ্রামে অনেকেই মৃত্যুরবণ করে সৃষ্টি করেছেন ইতিহাস! আবার অনেকেই এখনো জীবিত কিংবদন্তী। যেসব ঘটনা বা সে ঘটণায় সম্পৃক্ত যাদের কথা মিডিয়া বা বিশেষ ব্যক্তিদের নজরে এসেছে, তারাই ইতিহাস হয়েছেন। আর যারা মিডিয়া বা তাদের (বিশেষ ব্যক্তি) নজরে আসেননি, তারা চাপা পড়েছেন ইতিহাসের পাতায়! এটাই বাস্তব এবং এটাই সত্যি।

আজ এমন দু’জন মানুষের চাপা পড়ে যাওয়া ইতিহাসের কথা বলবো, তাদের একজন ঢাকা কলেজের সাবেক ছাত্রলীগ নেতাে এ এফ জসিম উদ্দিন আহমেদ, অন্যজন ওই কলেজেরই ডিগ্রী হোস্টেলের বয় সোলেমান।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট কিছু বিপদগামী সেনা সদস্য বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করার মধ্যদিয়ে স্বাধীন বাংলার ইতিহাসে সৃষ্টি করে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়! যা প্রতিনিয়তই পীড়া দিতো ছাত্রনেতা জসিমকে। ১৯৮২ সালের ১৫ আগষ্ট শোক দিবসে ঢাকা কলেজে জাতীয় পতাকার বদলে ষ্টানে কালো পতাকা উড়ানোর দুঃসাহসিক পরিকল্পনা করেন সেসময়ের ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি জসিম উদ্দিন আহমেদ। পরিকল্পনা মতে তিনি মার্কেট থেকে কালো কাপড় কিনে জাতীয় পতাকার মাপে সেলাই করে অতি গোপনে নিয়ে যান ঢাকা কলেজের ডিগ্রী হোষ্টেলে।

১৪ই আগষ্ট রাতে হোষ্টেল বয় সোলেমানকে ডেকে জসিম বলেন ‘আমার হাতের এই কালো পতাকা সন্ধ্যার পর কলেজের ২য় তলা ছাদের ওপর পতাকা স্টানের মধ্যে লাগাতে হবে। তোমার কোনো সমস্যা হবে না। স্টানে পতাকা লাগিয়ে তুমি নিচে আসা পর্যন্ত রাশেদুর রহমান মরিসসহ আমরা কয়েকজন সেখানে অপেক্ষা করবো। তাছাড়া তোমার কোনো সমস্যা হলে আমি দেখবো।’

সোলেমান এমনিতেই ছিলেন, বঙ্গবন্ধু প্রেমী। তাছাড়া ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা, যে নেতা ঢাকা কলেজে এরশাদের মতো স্বৈরাচারকে ঢুকতে দেননি- সেই ছাত্রনেতা জসিমের আদেশ। তার কথায় রাজি হয়ে ১৪ আগষ্ট গভীর রাতে ঢাকা কলেজের জাতীয় পতাকা স্টানে কালো পতাকা উড়িয়ে দেন সোলেমান। তখনও তিনি জানতেন না-কি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তিনি!

পরদিন ১৫ আগষ্ট। কলেজে ছাত্র-শিক্ষকদের আসা শুরু হয়। জাতীয় পতাকা স্টানের দিকে তাকিয়ে সবাই অবাক! বীর দর্পে উড়ছে কালো পতাকা। প্রতিবাদ ও শোকের বার্তা সেই কালো পতাকা আন্দোলিত করছে পুরো কলেজ ক্যাম্পাস।
দ্রুত সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ে চারদিক, এমনকি বিভিন্ন দূতাবাসেও। একাধিক বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমের দৃষ্টিগোচর হয়, হৈচে পড়ে যায়। কেউ স্বীকৃতি দিক আর না দিক, সে সময় এটা একটা ইতিহাস, এরশাদ সরকারের আমলে সেদিন প্রথম কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৫ আগষ্ট কালো পতাকা উড়েছিল। তাও রাজধানীর প্রসিদ্ধ একটি বিদ্যাপিঠ ঢাকা কলেজে!

ওই সময়ের কলেজ অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নোমান বুঝতে পেরেছিলেন, দেশের সব কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে পারলেও যার ভয়ে ঢাকা কলেজে ঢুকতে পারেনি এরশাদ, সেই দুঃসাহসী বঙ্গবন্ধু প্রেমী জসিম ছাড়া কারো পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়!

এই প্রতিবেদককে সেদিনের ঘটণা এভাবেই বর্ণনা করেন জসিম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমাকে অধ্যক্ষ তার অফিসে ডাকলেন, বিষয়টি জানতে চাইলে আমিও অকপটে স্বীকার করেছিলাম, অধ্যক্ষ নিজেও আমাকে পছন্দ করতেন। সেদিন অধ্যক্ষ বলেছিলেন, ওপর থেকে চাপ আসছে এই পতাকা না-নামালে তার (অধ্যক্ষ) ওপর বিপদ আসবে।

জসিম এই প্রতিবেকদকে বলেন, ‘আমার উদ্দেশ্য ছিল, বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, বিশ্ব গণমাধ্যম এবং সরকারের উচ্চ মহল জানুক। আমি সফল হয়েছি, তাই তখন অধ্যক্ষ মহোদয়কে বললাম আমার কাজ আমি করেছি, আপনার কাজ আপনি করেন।’

তিনি আরও বলেন, স্টানে পতাকা লাগানো হোস্টেল বয় সোলেমানের নামটি নিরাপত্তার খাতিরে সেদিন গোপন রাখা হয়েছিল। ভাগ্য অনুকূল ছিল বলে তাকে কেউ দেখেনি, দেখলে হয়তো পরের দিন বিনা নোটিশে চাকুরি হারানোসহ অনির্দিষ্টকালের জন্য জেল-জুলুম নির্যাতনের ভাগ্য বরন করতে হতো তাকে। আল্লাহর অশেষ রহমতে আজো বেঁচে আছেন সোলেমান।

জসিম আরও বলেন, পরে বুঝতে সোলেমান পেরেছিলেন, কি ইতিহাস রচনা করেছেন তিনি। জীবন মরণ খেলায় অংশগ্রহণ করলেও সোলেমান তাতে ছিলেন চরম তৃপ্ত! জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে মতো মহান ব্যক্তিত্বের স্মরণে কিছু করতে পেরে সোলেমান ছিলেন অভিভূত এবং আনন্দিতও!

১৫ আগষ্ট স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা দিবসে ঢাকা কলেজের স্টানে কালো পতাকা উড়ানোর দু:সাহস তিনি কোথায় পেয়েছিলেন- এমন প্রশ্নের জবাবে জসিম জানান, ‘১৫ ই আগষ্ট প্রতিনিয়তই আমাকে পীড়া দিত! কিন্তু কিছু করার সাহস পেতাম না! ১৯৮১ সালে সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশে আসায় আমি মানুষিক শক্তি পাই! এই ভেবে যে, এই ঢাকা কলেজেরই ছাত্র ছিলেন শেখ কামাল, শেখ জামালসহ শেখ পরিবারের অনেক সদস্য। তাই এই কলেজে শোকের পতাকা না উড়ালে ছাত্রনেতা হিসেবে নিজেকে খুব ছোট মনে হবে! এই কারণেই আমার এই পদক্ষেপ।’

পরিশেষে জসিম উদ্দিন আহমেদ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা না দিলেই নয়, তিনি দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করতেন। রাজনীতির মাঠে দলকে সুসংগঠিত করাসহ দলকে ক্ষমতায় আসীন করানোর পরিকল্পনা ছাড়া ভিন্নকিছু মাথায় ছিল না তার। রাজনীতিতে স্বচ্ছ, পরিচ্ছন, সাংগঠনিক ও ত্যাগী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্নেহের পাত্র ছিলেন তিনি। ঢাকা কলেজের পরবর্তী সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ছিলেন তিনি!

জসিম ১৯৮৪ সালে খন্দকার মোসতাককে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে তার বাসা পর্যন্ত কৌশলে পৌছে যান। কঠিন নিরাপত্তা বলয়ের কারণে মিশন বাস্তবায়ন করতে না পেরে ফিরে আসেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর বিচারের দাবিতে ১৯৮৫ সালে বিমান ছিনতাই করারও পরিকল্পনাও করেন জসিম। যা বাস্তবায়ন করার পূর্বেই বিমানে নজরুলের পাগলামীর কারণে বাংলাদেশ বিমান নিজেদের নিরাপত্তা আরো বাড়িয়ে দেয়। ফলে সেই মিশনও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

এছাড়াও ১৯৮৭ সালের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর ছবি দিয়ে রঙ্গিন পোষ্টার করেন এই মুজিব প্রেমিক। বঙ্গবন্ধুর অডিও, ভিডিও ভাষণ সংগ্রহ করে তা কপি করে দেশের বিভিন্নস্থানে বাঁজানোর জন্য দলীয় নেতাদের কাছে পাঠাতেন তিনি। বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে বই মেলায় বজ্র প্রকাশনির ব্যানারে স্টল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি দিয়ে স্টিকার, ক্যালেন্ডার, ছবির ফটোকপি বিক্রী করাসহ বঙ্গবন্ধুর ভাষন বাঁজাতেন জসিম।

উল্লেখিত অধিকাংশ কর্মকান্ড ছিলো ‘আমরা ক’জন মুজিব সেনা’র সদস্যদেও সঙ্গে নিয়ে। উল্লেখ্য, আওয়ামী রাজনীতির দুঃসময়ে এ সংগঠনটি ছিলো বহুল পরিচিত একটি নাম, যার প্রতিষ্ঠাতা তিনি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে কারাবরণও করেন তিনি। নিজ নির্বাচনী এলাকা লক্ষ্মীপুর  জেলাসহ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যার হাতে গড়া অসংখ্য নেতাকর্মী বর্তমানে আওয়ামী লীগ এবং দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের কাছে আজও তিনি সমাদৃত।