নির্বাচনী প্রস্তুতি লক্ষ্মীপুর-৪ রামগতি ও কমলনগর আওয়ামী লীগে দ্বন্ধ বিএনপি আতঙ্কে রব ও মেজর মান্নান ফ্যাক্টর

নিউজ ডেস্ক:
জেলার রামগতি ও কমলনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়েছে বহু আগেই। এ আসনে আওয়ামলীগের মধ্যে দ্বন্ধ এখন প্রকাশ্য রুপ ধারণ করেছে। বর্তমাস সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সাবেক সাংসদ কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী’র সমর্থকরা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এ দুজন ছাড়া অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরাও প্রচারণা চালাচ্ছে। এদিকে বিএনপি রয়েছে আতঙ্কে। সাবেক সাংসদ আশ্রাফ উদ্দিন নিজাম ও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবকদলের সভাপতি শফিউলবারী বাবুর সমর্থকরা পৃথক অবস্থান নিতে দেখা গেছে। অন্য সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে কাজ করছে। এদিকে জেএসডি সভাপতি ও স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলক আ স ম আব্দুর রবকে নিয়ে উৎকন্ঠায় রয়েছে বিএনপি। অপরদিকে বিকল্প ধারার মহা সচিব মেজর আব্দুল মান্নানও এ আসনে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে কাজ করছেন বলে জানা যায়।
জানা যায়, প্রচারে এগিয়ে শাসক দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। নানামুখী চাপের পরও বিএনপির একাধিক নেতা কৌশলে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। রাজনীতিবিদদের উর্বর ভূমি নামে পরিচিত এ আসনে বিএনপির দুই দাপুটে নেতা রামগতি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক এমপি আশরাফ উদ্দিন নিজান এবং কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু মনোনয়ন প্রত্যাশী। এ ছাড়াও খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও কমলনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোহাম্মদ সামছুল আলম ও কেন্দ্রীয় তাঁতীদলের সহ-সভাপতি আবদুল মতিনও নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের তোড়জোড় বেড়েছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি প্রার্থী ছাড়াও জেএসডি প্রার্থী নির্বাচনী মাঠ সাজাতে চেষ্টা করছেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডির) সভাপতি সাবেক মন্ত্রী ও স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলক আ স ম আবদুর রব সাংগঠনিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করেছেন। এলাকায় তার আসা যাওয়া বেড়ে যাওয়ায় কর্মীরাও ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে। নিষ্ক্রিয় নেতাকর্মীরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
জানতে চাইলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘আমি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই। এমন নির্বাচন চাই যেখানে সবার অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে, ভোটাররা নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারবে, ভোটকেন্দ্রে সবার জন্য সুরক্ষিত থাকবে।’
সম্ভাব্য প্রার্থীরা সামাজিক ও জনকল্যাণকর কর্মকান্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করছেন বেশি বেশি। এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে প্রার্থীদের ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন ছেয়ে গেছে। তৃণমূলের পাশাপাশি কেন্দ্রের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা।
আসনটি মূলত বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। বিশেষ করে নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালের প্রথম নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির প্রয়াত সিএসপি আবদুর রব চৌধুরী, ১৯৯৬ সালে বিজয়ী হন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব। ২০০১ ও ২০০৮ সালে এমপি হন বিএনপির আশরাফ উদ্দিন নিজান। তবে সবশেষ ২০১৪ সালের বিএনপিবিহীন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। আগামী নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের শক্ত প্রার্থী।
লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের এমপি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, গত চার বছর এখানে নদী শাসন, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গুচ্ছগ্রাম ও আশ্রয়ন প্রকল্পসহ ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। মেঘনা নদীভাঙন রোধে তীররক্ষা বাঁধ হয়েছে, অবশিষ্ট কাজের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন। কাজ না করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করে এলেও জামায়াত-বিএনপির অনুসারীরা আমার বিরুদ্ধে অপ-প্রচার করছে। আমার নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগসহ সব অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ। এখানে কারও সঙ্গে কারও বিরোধ নেই। সবাই নৌকার জন্য কাজ করছে।
বর্তমান এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন ছাড়াও আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হচ্ছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান, কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক আব্দুর জাহের সাজু, রামগতি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবদুল ওয়াহেদ, কমলনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শামছুল কবির।
সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক এমপি ফরিদুন্নাহার লাইলী ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন এবং সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকান্ডের কথা তুলে ধরছেন। স্থানীয় প্রতিনিধিদেরও সহযোগিতা পাচ্ছেন এই নারী রাজনীতিক।
মেঘনার ভাঙনরোধে নদী তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণে ভূমিকা রাখায় অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান স্থানীয় ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন। তিনি এখন রামগতি-কমলনগরবাসীর আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
নির্বাচনী ভাবনা নিয়ে কথা হয় সংরক্ষিত আসনের এমপি ফরিদুন্নাহার লাইলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করছে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আগামী সংসদ নির্বাচনে জনগণ নৌকায় ভোট দিয়ে শেখ হাসিনাকে দেশের সরকারপ্রধান করবেন। সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।’
জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘২০০৮ সালে মনোনয়ন বোর্ডে দলীয় টিকিট না চেয়ে রামগতি-কমলনগরের নদীভাঙন প্রতিরোধে তীররক্ষা বাঁধ ও বিদ্যুৎ চেয়েছি। জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং সে অনুযায়ী নদী তীররক্ষা বাঁধ ও বিদ্যুৎ দিয়েছেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ। নদীভাঙন রোধে কাজ করায় আওয়ামী লীগের সমর্থন বেড়েছে। দল মনোনয়ন দিলে আগামী নির্বাচনে জনগণ ভোট দিয়ে আমাকে নির্বাচিত করবেন।’
আওয়ামী লীগের অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী আব্দুর জাহের সাজু বলেন, ছাত্রজীবন থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে দলের জন্য কাজ করছি। আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন চাইব। রামগতি ও কমলনগর মানুষের সেবায় তাদের পাশে থেকে কাজ করতে চাই।
আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলা-মামলা ও পুলিশি হয়রানির কারণে বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে দলীয় কর্মকান্ড করতে পারেননি সেভাবে। চাপের মুখেও বিভিন্ন সময় আশরাফ উদ্দিন নিজান ও শফিউল বারী বাবু এলাকায় এসে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন বলে বিএনপি’র দাবী। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে বিএনপি জোটের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় ১০০ মামলা হয়েছে। এতে পাঁচ হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। বিনা খরচে সব মামলা পরিচালনা করছেন বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী অ্যাডভোকেট সৈয়দ মৈাহাম্মদ শামছুল আলম। তিনি রাজনৈতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকায় নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অসহায়দের আর্থিক অনুদান দিয়ে ভোটারদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, আসনটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। বিএনপির আমলে সাবেক এমপি আশরাফ উদ্দিন নিজানের মাধ্যমে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে এখানে খালেদা জিয়া যাকে মনোনয়ন দেবেন সবাই এক হয়ে তাকে নির্বাচিত করবেন।
রামগতি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, ‘খালেদা জিয়া এখন সরকারের গভীর চক্রান্ত এবং নীলনকশার কারণে জেলবন্দি। এ মুহুর্তে দেশনেত্রীর মুক্তি ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা করছি না। তারেক রহমান দলের দায়িত্বে আছেন। দল নির্বাচনে যাবে কি, না। গেলে কী করতে হবে। তিনি (তারেক রহমান) যেভাবে সিদ্ধান্ত দেবেন সেভাবেই কাজ করব।’
জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোহাম্মদ শামছুল আলম বলেন, ‘দল নির্বাচনে গেলে, মনোনয়ন চাইব। মনোনয়নের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। ধানের শীষ পাবই এবং জয়লাভ করে খালেদা জিয়াকে আসনটি উপহার দেব।’
বিএনপি নেতা আবদুল মতিন চৌধুরী বলেন, ‘জিয়াউর রহমান বিপন্ন অবস্থা থেকে দেশ রক্ষা করেছেন। এখন গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য খালেদা জিয়া আন্দোলন করছেন। শহীদ জিয়ার সৈনিক হিসেবে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করার শপথ নিয়েছি। মানুষের জন্য রাজনীতি করছি। উন্নয়নের অংশীদার হতে দলীয় মনোনয়ন চাইছি। আশা করি দল মূল্যায়ন করবে।’